দাম্পত্যের বহুচর্চিত ‘সাত বছরের সংকট’-এর কথা অনেকেই জানেন। কথিত আছে, বিয়ের প্রথম দিকের মধুচন্দ্রিমার আবেশ এই সময়ের মধ্যে ফিকে হয়ে আসে। জায়গা নেয় দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা, বাড়তে থাকে সম্পর্কের টানাপড়েন।

কিন্তু ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। বিয়ের সাত বছর নয়, বরং কুড়ি বছর বা তারও বেশি সময় সংসার করার পরই এখন সবচেয়ে বেশি বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। ব্রিটেনের জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর (ওএনএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, নারী-পুরুষ দম্পতিদের মোট বিবাহবিচ্ছেদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ঘটেছে বিয়ের অন্তত কুড়ি বছর পরে।

তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনেও দেখা যাচ্ছে একই প্রবণতা। ‘স্ট্রিক্টলি’র প্রাক্তন সঞ্চালক টেস ডেলি সম্প্রতি তাঁর স্বামী, সঞ্চালক ভার্নন কের সঙ্গে ২২ বছরের দাম্পত্যে ইতি টেনেছেন। ‘ডাউনটন অ্যাবি’র অভিনেতা হিউ বনেভিল ২০২৩ সালে স্ত্রী লুলু উইলিয়ামসের থেকে আলাদা হন ২৫ বছর সংসার করার পর। ২০১৯ সালে বিয়ের ২২ বছর পর স্ত্রী লিভিয়া জিউজ্জোলির সঙ্গে বিচ্ছেদের কথা ঘোষণা করেন অভিনেতা কলিন ফার্থ। গত বছর প্রায় দুই দশকের দাম্পত্যের পর আলাদা হয়ে যান হলিউড অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যান ও গায়ক কিথ আরবানও।

বিবাহবিচ্ছেদের মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীরা আগেই জানিয়েছিলেন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে অনেক দম্পতিই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও তার ইঙ্গিত মিলেছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে গত বছর যে বিবাহগুলির বিচ্ছেদ হয়েছে, সেগুলির গড় স্থায়িত্ব অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ওএনএসের পরিসংখ্যান ‘সাত বছরের সংকট’-এর ধারণাকেই যেন সমর্থন করেছে। ১৯৬৩ সালে বিবাহবিচ্ছেদের নথি রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই মোট বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় অংশ ঘটেছে বিয়ের পাঁচ থেকে নয় বছরের মধ্যে।

কিন্তু গত বছর ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে নারী-পুরুষ দম্পতিদের মধ্যে মোট ১ লক্ষ ২ হাজার ৮৭৯টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ শতাংশের ক্ষেত্রেই দাম্পত্যের বয়স ছিল কুড়ি বছর বা তার বেশি। অন্যদিকে, বিয়ের পাঁচ থেকে নয় বছরের মধ্যে বিচ্ছেদের হার ছিল ২৩ শতাংশ।

পাঁচ থেকে নয় বছরের দাম্পত্যের পরিসংখ্যান দ্বিতীয় স্থানে নেমে আসার ঘটনা এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ঘটল। এর আগে আশির দশকের মাঝামাঝি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সে সময় নতুন একটি আইনে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার আগে বিয়ের ন্যূনতম মেয়াদ তিন বছর থেকে কমিয়ে এক বছর করা হয়েছিল।

সন্তানের জন্যই কি এত দিন একসঙ্গে থাকা?

বিবাহবিচ্ছেদের আইনজীবীদের মতে, দীর্ঘ দাম্পত্যের পর বিচ্ছেদের হার বাড়ার অন্যতম কারণ সন্তান। অনেক দম্পতিই সন্তানের কথা ভেবে অসুখী সম্পর্কেও বছরের পর বছর একসঙ্গে থেকে যান।

অসবর্নস ল-এর বিবাহবিচ্ছেদ-বিষয়ক আইনজীবী লিসা পেপার ‘সানডে টাইমস’কে বলেন, “আমার কাছে যত মামলা আসে, তার সবচেয়ে বড় অংশই দীর্ঘ দাম্পত্যের পর বিচ্ছেদের। সন্তানের কথা ভেবে একসঙ্গে থেকে যাওয়ার বিষয়টি সত্যি।”

আমেরিকাতেও বাড়ছে দীর্ঘ দাম্পত্যের বিচ্ছেদ

একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে আমেরিকাতেও। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কুড়ি বছরের দাম্পত্যের পর বিবাহবিচ্ছেদের হার নব্বইয়ের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, জীবনের বেশি বয়সে বিবাহবিচ্ছেদের কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। এই পর্যায়ে বিচ্ছেদের মুখে পড়া মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা সাধারণত বিবাহিত কিংবা সঙ্গীকে হারানো মানুষের তুলনায় কম থাকে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি বেশি প্রকট হতে পারে। বেশি বয়সে একা থাকার ফলে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যও ধাক্কা খেতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে সামাজিক জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আমেরিকার আইন সংস্থা ওয়াইনবার্গারের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সারা জীবন বিবাহিত থাকাকে এখন আর সফল প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের চূড়ান্ত মাপকাঠি বলে মনে করা হয় না—বিশেষ করে দেশের তুলনামূলক প্রগতিশীল অঞ্চলগুলিতে। যাঁদের একা থেকেও ভালোভাবে জীবন কাটানোর মতো আর্থিক সংস্থান রয়েছে, তাঁরা অসুখী সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা অনুভব করতে পারেন।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যে কোনও পরিস্থিতিতেই একসঙ্গে থাকতে হবে—এই সামাজিক চাপ ক্রমশ কমছে। ফলে বেশি বয়সে বিবাহবিচ্ছেদ করা মানুষদের অসুখী দাম্পত্য থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের শেষ পর্বকে আরও সুন্দর করে তোলার সামাজিক স্বীকৃতিও বাড়ছে।

ওএনএসের আগে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২০২৫ সালে যে বিবাহগুলির বিচ্ছেদ হয়েছে, সেগুলির গড় স্থায়িত্ব ছিল ১৩ বছর। ১৯৬৩ সালে নথি রাখা শুরু হওয়ার পর এটাই সর্বোচ্চ। তুলনায়, ১৯৮৫ সালে এই গড় স্থায়িত্ব নেমে এসেছিল মাত্র ৮.৯ বছরে।

বিবাহবিচ্ছেদ-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইন সংস্থা ক্লার্ক উইলমটের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট রেবেকা অ্যাস্টন-জোন্সের মতে, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় অসুখী দম্পতিদেরও একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করছে।

তাঁর কথায়, “বিবাহবিচ্ছেদের পথে এগোতে মানুষকে নিরুৎসাহিত করছে যে বিষয়গুলি, তার অন্যতম হল দু’টি আলাদা সংসার গড়ে তোলা এবং চালিয়ে যাওয়ার বিপুল আর্থিক চাপ।”